বলি আর কোরবানি এক নয়, বাধা দিলে লাখো মানুষ নিয়ে রাস্তায় নামব!’ সরকারের বিরুদ্ধে চরম হুঁশিয়ারি আজুপ (AJUP) নেতা হুমায়ুন কবীরের

বলি আর কোরবানি এক নয়, বাধা দিলে লাখো মানুষ নিয়ে রাস্তায় নামব!

সামনেই পবিত্র বকরি ঈদ বা ঈদ-উল-আযহা (Eid-ul-Adha)। আর এই উৎসবের প্রাক্কালে প্রকাশ্যে পশু ‘বলি’ বা কোরবানি দেওয়া নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি প্রশাসনিক নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে চরম বিতর্কের সৃষ্টি হলো। এই নির্দেশিকার তীব্র বিরোধিতা করে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধেই কার্যত যুদ্ধঘোষণা করলেন রাজ্যের দাপুটে নেতা এবং সদ্য গঠিত রাজনৈতিক দল ‘আজুপ’ (AJUP)-এর সুপ্রিমো হুমায়ুন কবীর

তৃণমূল কংগ্রেসের (TMC) সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজের নতুন দল আজুপ (AJUP) গঠন করার পর এই প্রথম কোনো ধর্মীয় ও প্রশাসনিক ইস্যুতে এত বড় মাপের হুঁশিয়ারি দিলেন তিনি। সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, সরকার যদি জোরপূর্বক এই নির্দেশিকা কার্যকর করতে যায়, তবে তিনি লাখো মানুষ নিয়ে রাস্তায় নেমে এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিরোধ করবেন।

 

‘বলি’ এবং ‘কোরবানি’ এক নয়: নির্দেশিকা নিয়ে প্রশ্ন

প্রকাশ্যে পশু বলি দেওয়া যাবে না—রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের এই নির্দেশিকার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে আজুপ নেতা হুমায়ুন কবীর প্রথমেই ‘বলি’ এবং ‘কোরবানি’র মধ্যেকার ধারণাগত ও ধর্মীয় পার্থক্য স্পষ্ট করে দেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে বলেন, “মুসলমানদের এই পবিত্র উৎসবকে কোনোভাবেই ‘বলি’ বলা যায় না। এটি হলো ‘কোরবানি’, যার প্রকৃত অর্থ হলো ‘ত্যাগ’।”

তাঁর মতে, রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তর বা প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে বা জনসাধারণকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো নির্দেশিকা জারি করতেই পারে। কিন্তু কোরবানির মতো একটি পবিত্র এবং সংবেদনশীল ধর্মীয় প্রথাকে সাধারণ ‘বলি’র সাথে তুলনা করা বা গুলিয়ে ফেলা কোনোভাবেই প্রশাসনিক বিচক্ষণতার পরিচয় নয়। তাঁর দাবি, এই ধরনের নির্দেশিকা অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং এটি সরাসরি ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার শামিল।

১৪৫৬ বছরের ইসলামি ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা

কোরবানির গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট বোঝাতে গিয়ে হুমায়ুন কবীর ইসলামের ইতিহাসের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “শুধু ভারতবর্ষ নয়, গোটা বিশ্বের মুসলমানদের কাছে এটি একটি অত্যন্ত পবিত্র ধর্মীয় প্রথা। আজ থেকে ১৪৫৬ বছর আগে থেকে এই প্রথা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলে আসছে।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন যে, ইসলাম ধর্মে দুটি প্রধান উৎসব রয়েছে। এক মাস রোজা রাখার পর যে ঈদ আসে, তাকে বলা হয় ‘ঈদ-উল-ফিতর’ বা খুশির ঈদ। আর তার ঠিক আড়াই মাস পর চাঁদ উঠলে পালিত হয় ‘ঈদ-উল-আযহা’ বা কোরবানির ঈদ। প্রতি বছর এই ঈদের দিন নমাজ পাঠের পর পশু কোরবানি দেওয়াটা সেই সমস্ত মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক (Mandatory), যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে। এটি নিছক কোনো উৎসব নয়, এটি হলো ত্যাগের প্রতীক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো মুসলিম ব্যক্তি কোরবানির সময় কখনোই চাইবেন না অন্য ধর্মের বা সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে কোনো রকম সংঘাতে জড়াতে। এটি একটি শান্তিপূর্ণ এবং পবিত্র ধর্মীয় আচার।

 

প্রকাশ্যে বলি নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ: জামালপুরের প্রসঙ্গ

সরকারি নির্দেশিকায় প্রকাশ্যে পশু বলি বা কোরবানির ওপর আপত্তির জায়গাটিকে তীব্র আক্রমণ করেন আজুপ (AJUP) নেতা। তিনি রাজ্য সরকারের এই নীতির মধ্যে দ্বিচারিতা এবং বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন। পালটা যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “যদি প্রকাশ্যে বলির কথাই বলা হয়, তবে বর্ধমান জেলার জামালপুরে ‘বাবার স্থানে’ তো প্রকাশ্যে প্রচুর ভেড়া, ছাগল বলি দেওয়া হয়। সেখানে তো কই প্রশাসন কোনো বাধা দেয় না! তাহলে মুসলমানদের বকরি ঈদের কোরবানির ক্ষেত্রে এই বিশেষ নির্দেশিকা কেন?”

তাঁর এই বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট শোরগোল ফেলেছে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, প্রশাসন যদি নিয়ম করে, তবে তা সব ধর্মের জন্য সমান হওয়া উচিত। নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের পবিত্র উৎসবের আগে এমন নির্দেশিকা জারি করে সরকার আদতে মুসলিমদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করেছে বলেই তাঁর অভিযোগ।

‘লাখো মানুষ নিয়ে রাস্তায় নামব’: চরম হুঁশিয়ারি

সাক্ষাৎকারের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্যে কার্যত সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন হুমায়ুন কবীর। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, নির্দেশিকা জারি হলেও তা বাস্তবায়িত করা অত্যন্ত কঠিন এবং এর পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ। তিনি বলেন, “সরকার বা প্রশাসন যদি কড়া পদক্ষেপ করে এই নির্দেশিকা বলবৎ করতে যায়, অর্থাৎ প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে কোরবানি বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে, তবে আমি হুমায়ুন কবীর এই সরকারের বিরুদ্ধেই লাখো লাখো মানুষ নিয়ে রাস্তায় নেমে এটাকে প্রতিরোধ করব।”

তাঁর এই মন্তব্য বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, এই ইস্যুতে তিনি কোনোভাবেই পিছু হটতে রাজি নন এবং প্রয়োজনে বৃহত্তর গণআন্দোলনের পথে হাঁটতেও তাঁর দল আজুপ (AJUP) পিছপা হবে না।

তৃণমূল ছেড়ে আজুপ (AJUP)-এ হুমায়ুন: নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ

হুমায়ুন কবীরের এই বিস্ফোরক মন্তব্যের পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। একসময় তিনি ছিলেন তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম প্রভাবশালী বিধায়ক। কিন্তু দলের সাথে মতবিরোধের জেরে তৃণমূল ছেড়ে তিনি নিজের নতুন রাজনৈতিক দল আজুপ (AJUP) গঠন করেছেন।

নতুন দল গঠন করার পর সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক সুসংহত করা এবং নিজের রাজনৈতিক জমি শক্ত করার জন্য এই কোরবানির ইস্যুটিকে তিনি হাতিয়ার করতে চাইছেন বলে মনে করা হচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থন পেয়ে এসেছে। কিন্তু হুমায়ুন কবীর এখন সরাসরি রাজ্য সরকারের নীতিকে ‘সংখ্যালঘু বিরোধী’ বা ‘ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ’ হিসেবে তুলে ধরে তৃণমূলের সেই ভোটব্যাঙ্কে বড়সড় ফাটল ধরাতে চাইছেন। লাখো মানুষ নিয়ে রাস্তায় নামার যে ডাক তিনি দিয়েছেন, তা আদতে তাঁর নতুন দলের শক্তি প্রদর্শনেরও একটি কৌশল।

প্রশাসন ও সরকারের অস্বস্তি

সামনেই বকরি ঈদ। তার ঠিক আগে রাজ্যের একজন দাপুটে সংখ্যালঘু নেতার এমন প্রকাশ্য হুঁশিয়ারি রাজ্য সরকারকে স্বাভাবিকভাবেই প্রবল অস্বস্তিতে ফেলেছে। রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সেদিকে পুলিশ প্রশাসনকে কড়া নজর রাখতে হচ্ছে। যেকোনো ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগলে তা বড়সড় আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে। তাই হুমায়ুন কবীরের এই মন্তব্যের পর রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র দপ্তর বা শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে গোটা রাজনৈতিক মহল।

উপসংহার

গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিটি নাগরিকের নিজস্ব ধর্ম পালনের অধিকার সংবিধান স্বীকৃত। অন্যদিকে, রাজ্যের শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখাও প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সরকারের কাজ। কিন্তু হুমায়ুন কবীর যেভাবে কোরবানির অধিকার রক্ষায় সরব হয়েছেন এবং নিজের নতুন দল আজুপ (AJUP)-এর ব্যানার নিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন, তাতে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আরও একটি নতুন মেরুকরণ দেখা যেতে পারে। আগামী বকরি ঈদে প্রশাসনিক নির্দেশিকা কতটা কড়াকড়িভাবে পালিত হয় এবং হুমায়ুন কবীরের হুঁশিয়ারির জল কতদূর গড়ায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Comment