মাসের শেষে ১ লক্ষ ২১ হাজার টাকা বেতন নিচ্ছি
কলকাতা: গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিধানসভা হলো এমন একটি পবিত্র স্থান, যেখানে সাধারণ মানুষের স্বার্থে আইন প্রণয়ন হয় এবং জনপ্রতিনিধিরা জনগণের অভাব-অভিযোগ তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তবে কি জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন? রাজ্য বিধানসভার নবনির্বাচিত অধিবেশনে দাঁড়িয়ে এবার ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলে ধরলেন ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট (ISF)-এর তরুণ বিধায়ক মহম্মদ নওশাদ সিদ্দিকী। নিজের দলের পাশাপাশি শাসক ও বিরোধী সব পক্ষের বিধায়কদের কার্যত আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে তিনি যে ঝাঁঝালো ও গঠনমূলক বক্তব্য রেখেছেন, তা ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর ইতিবাচক বার্তার প্রশংসা ও গঠনমূলক বিরোধিতার প্রতিশ্রুতি এদিন বিধানসভায় নিজের বক্তব্যের শুরুতেই একটি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন নওশাদ। তিনি নবনির্বাচিত স্পিকারকে ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বার্তার প্রশংসা করেন। সাধারণত দেখা যায়, বিরোধী দলের বিধায়করা কোনো সরকারি দপ্তরে চিঠি দিলে তা অনেক সময় ব্রাত্য থেকে যায়। কিন্তু নওশাদ জানান, মুখ্যমন্ত্রী এবার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে বিরোধী বিধায়কদের চিঠিপত্র বা আবেদনগুলোকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা স্বীকৃতি দেবেন (Recognize করবেন) এবং যথাযথ গুরুত্ব দেবেন। এই পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়ে আইএসএফ বিধায়ক স্পষ্ট করে দেন যে, তাঁর দল বিধানসভায় কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করবে না। তিনি বলেন, “আমরা অহেতুক বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করব না। রাজ্যের মানুষের স্বার্থে এবং যাঁদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এসেছি তাঁদের স্বার্থে আমরা পজিটিভ এবং গঠনমূলক কথা বলব।” রাজনীতিতে এই ধরনের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণ মানুষের কাছে একটি ভালো বার্তা পৌঁছে দেয় বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ববোধ ও বেতনের প্রসঙ্গ: ‘আমরা মানুষের জন্য কী করছি? নওশাদ সিদ্দিকীর এদিনের বক্তব্যের সবথেকে আকর্ষণীয় এবং বিস্ফোরক অংশটি ছিল বিধায়কদের বেতন এবং দায়িত্ববোধ নিয়ে। সাধারণ মানুষের করের টাকায় জনপ্রতিনিধিরা যে বেতন পান, তার বিনিময়ে তাঁরা কতটা কাজ করেন, সেই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “মাসের শেষে আমরা ১ লক্ষ ২১ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি। কিন্তু হাউসের মধ্যে এসে আমরা মানুষের জন্য কী ভূমিকা পালন করছি? শুধু কি হাউসে এসে সময় কাটিয়ে চলে যাচ্ছি? তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এমন একটি ক্ষোভ রয়েছে যে, জনপ্রতিনিধিরা ভোটে জেতার পর বিধানসভায় গিয়ে নিজেদের মূল দায়িত্ব ভুলে যান এবং কেবল রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়িতে ব্যস্ত থাকেন। নওশাদ সিদ্দিকী ঠিক সেই সাধারণ মানুষের মনের কথাটিই বিধানসভার ফ্লোরে দাঁড়িয়ে তুলে ধরেছেন। বিধানসভা লাইভ স্ট্রিমিং: স্বচ্ছতার নতুন যুগ বিধায়কদের এই দায়িত্ববোধের প্রসঙ্গ টেনেই নওশাদ সিদ্দিকী বিধানসভার অধিবেশন লাইভ স্ট্রিমিং (Live Streaming) করার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান। তিনি জানান, এর ফলে সাধারণ মানুষ এবার সরাসরি দেখতে পাবেন তাঁদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিধানসভায় গিয়ে কী করছেন।
আগামী ৫ বছর বাংলার মানুষের জন্য কী আইন তৈরি হচ্ছে, তা সরাসরি মানুষের দরবারে পৌঁছানো প্রয়োজন। নওশাদ নির্দিষ্ট করে বলেন যে, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো, কর্মসংস্থানের অভাব, কৃষকের রুজিরুটি থেকে শুরু করে প্যারা-টিচারদের সমকাজে সমবেতনের মতো অত্যন্ত জ্বলন্ত ইস্যুগুলো নিয়ে বিধানসভায় কী আলোচনা হচ্ছে, তা লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে বাংলার আপামর জনতার জানা উচিত। এর ফলে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং স্বচ্ছতা আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ইস্তফার ভাবনা ও ভোট পরবর্তী হিংসার যন্ত্রণা এদিন নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে একসময় বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন আইএসএফ নেতা। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর তাঁর এবং তাঁর দলের কর্মীদের ওপর যে রাজনৈতিক চাপ ও হিংসা নেমে এসেছিল, সেই স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, “নির্বাচন হওয়ার পর প্রথম ছ’টা মাস এমন দিন পার করেছি যে, আমার মনে হচ্ছিল আমি ইস্তফা দিয়ে দিই! অন্তত আমার ছেলেদের ওপর অত্যাচার যদি বন্ধ হয়। একইসাথে তিনি সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের ভোট পরবর্তী হিংসা (Post Poll Violence) এবং ভাঙচুরের ঘটনাও তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে, এর জন্য তিনি সরাসরি বিজেপি বা অন্য কাউকে দোষারোপ করছেন না, কিন্তু রাজ্যের যে কর্মী-সমর্থকরা রাজনৈতিক রোষের শিকার হয়েছেন, তাঁদের কথা ভাবা দরকার। পাশাপাশি রাজ্যের বেশ কিছু ধর্মস্থানে সাম্প্রতিক আক্রমণের প্রসঙ্গও তিনি উত্থাপন করেন। তিনি নির্দিষ্টভাবে মুখ্যমন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে এই বিষয়গুলোতে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার এবং নজর রাখার অনুরোধ জানান। বিরোধীদের কণ্ঠরোধের অভিযোগ ও স্পিকারের কাছে আর্জি বিধানসভায় শাসকদলের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধীদের কথা বলতে না দেওয়ার যে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে, এদিন স্পিকারের সামনে অত্যন্ত শালীনতার সাথে সেই বিষয়টিও তুলে ধরেন নওশাদ। তাঁর আক্ষেপ, “এই হাউসে বিরোধীদের বক্তব্য যদি শাসকদলের পছন্দ না হয়, তবে চিৎকার করে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০২১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত আমরা এই হাউসে এটাই দেখেছি। তিনি নবনির্বাচিত স্পিকারের কাছে জোড়হাতে আবেদন জানান যেন, আগামী ৫ বছর বিধানসভার গরিমা ও মর্যাদা অটুট থাকে। বিরোধী দলগুলো ছোট হলেও, তাদের গঠনমূলক মতামত তুলে ধরার জন্য পর্যাপ্ত সময় এবং পরিসর দেওয়া স্পিকারের দায়িত্ব। গণতন্ত্রে শাসক এবং বিরোধী—উভয়ের কণ্ঠস্বরই যে সমান গুরুত্বপূর্ণ, সেই কথাটি তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দেন।
বিশ্লেষণ ও আগামী দিনের রূপরেখা নওশাদ সিদ্দিকীর এই পুরো বক্তব্যটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি রাজ্যের একজন দায়িত্বশীল বিরোধী নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। লাইভ স্ট্রিমিংয়ের প্রসঙ্গ তুলে তিনি যেমন শাসকদলকে চাপে রাখলেন, তেমনি রাজ্যের বেকারত্ব, কৃষক সমস্যা ও শিক্ষকদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরে নিজের রাজনৈতিক জমিও শক্ত করলেন।
আগামী দিনে বিধানসভার অন্দরে রাজ্যের এই জ্বলন্ত সমস্যাগুলো নিয়ে কীভাবে আলোচনা হয় এবং সরকার বিরোধীদের এই গঠনমূলক প্রস্তাবগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেয়, বাংলার মানুষ এখন লাইভ স্ট্রিমিংয়ের মাধ্যমে সেদিকেই কড়া নজর রাখবেন। নওশাদ সিদ্দিকীর এই ভাষণ বাংলার পরিষদীয় রাজনীতিতে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতার এক নতুন অধ্যায় শুরু করল কি না, তা সময়ই বলবে।
